সোমবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১

সন্ধ্যা

 সন্ধ্যার সাথে দিন চক্রের একটা অদৃশ্য কানেকশন আছে। সন্ধ্যা মানেই পাখিদের ঘরে ফেরা, আকাশ লাল করে সূর্য ডোবা, সন্ধ্যা মানেই ছোটদের খেলার সময় শেষ, মসজিদে আজানের স্বর। সন্ধ্যা মানে ছিল অফিস শেষ করে হাটতে হাঁটতে বের হওয়া, রাস্তায় নুডলস, চিকেন এর দোকান এর পাশ দিয়ে যাবার সময় খুচরো খাওয়া দাওয়া, সন্ধ্যা মানে ছিল মোগলাই, জিলাপি, পুরিতে ধোঁয়া ওঠা কামড়।

কিংবা সন্ধ্যা মানে বাসের লাইনের ভিড়ে আমি দাঁড়িয়ে, কানে হেডফোনে রেডিওতে বাজতে থাকা শো, বাস না পেলে অচেনা বাইকারের পিছে সিট আকড়ে বসে থাকা, বায়ে প্লাস্টিক, ডানে এম্বুলেন্সের হিসেব কষে ফুটপাথ দিয়ে বাইক উঠিয়ে সময় বাচানো, ফ্লাইওভারে উঠে রাতের শহরের কাপা কাপা রাস্তা, মার্কেটের দোতলার চায়ের দোকান।

সন্ধ্যা ছিল পড়তে বসা, সন্ধ্যা ছিল কোচিং ছুটি, সন্ধ্যা ছিল চাদরাতে ঘুরতে বের হওয়া, সন্ধ্যা ছিল স্বাধীনতার প্রথম সিঁড়ি। সন্ধ্যা ছিল লেকের পাড়ে আড্ডা, স্কেচবুকে টুকিটাকি, মার্কেটে হাটা হাটী, শেষতক কফিশপে এক্সট্রা চিনির স্যাশেতে। সন্ধ্যা নিশ্চুপে প্রতিদিন এসে জানান দিয়ে গেছে একটা দিনের শেষ।

এখানে কি সন্ধ্যা হয়? ১৫ ঘন্টার দিনে কটকটে দিনের আলোতে অফিস ছুটির ঘন্টা বাজে, বিকেল পড়লে কফিশপে তালা ঝুলে, আলো পড়ে এলে শপিং মল বন্ধ। ঘড়ির সাথে দিনের আলো আর মিলাতে পারি না। বিকেলে না আমি হাঁটতে যাব? সন্ধ্যা হলে না পড়তে বসব? ফুটবল মাঠে দৌড়চ্ছি কিন্তু সন্ধ্যা হচ্ছে না। ঠান্ডা বাতাস কেটে যাচ্ছে কানের দুপাশ দিয়ে কিন্তু সূর্য ডুবছে না। আকাশ লাল হয়ে আসছে, ঘন্টার কাটা ঘুরছে-৭ টা, ৮ টা বেজে গেল-সন্ধ্যা হবে না? ফিরব না ঘরে?

বৃহস্পতিবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২১

কী নাই

প্রবাস জীবনে এখনো হানিমুন ফেজ চলছে-এদিক সেদিক যাই, খাই দাই, ঘুরি ফিরি। ব্যস্ততা, দৈনন্দিন হিসাব নিকেশ, মাসের শেষে বিলের ধাক্কা, কাজ কর্ম কিছুই শুরু হয়নি এখনো। রঙ্গিন চশমা এটে তাই আশ পাশ দেখি, কিন্তু কি যেন নেই। রাস্তা পার হবার আগে বেল টিপে কানে হেডফোন গুজে নিশ্চিন্তে  চলে যাওয়া যায়-ডানে বামে তাকিয়ে পার হওয়ার সেই শিক্ষা অকেজো এখন। বাস স্ট্যান্ডে দাড়াও-গুগল বলে দিবে কোথায় আছে বাস, ফোনে নম্বর টিপে জেনে নিতে পার পরের বাস আসতে কত সময় লাগবে। "ভাই অমুক জায়গায় যেতে কোন দিকে যাব" -এই প্রশ্নে অচেনা কারো হাত নেড়ে মোড়ে যাবার আশ্বাসে হাটবার সময় ফুরিয়েছে। দেখতে দেখতে ট্রেন চলে আসে, স্কাই ট্রেন, মেট্রো রেল, এক্সপো লাইন, কানাডা লাইন। টিক টিক করে সময় বলে দিচ্ছে ২ মিনিটের মাথায় এসে যাবে ট্রেন-ঘড়ির কাটা ধরে ঠিক ঠিক নামিয়ে দেবে স্টেশনে। টুক টুক করে কার্ড ঘষটে নেমে ম্যাপ দেখে দেখে চলে যাও রাস্তা ধরে।

শহর থাকবে অনেক গোছান, উচু নিচু রাস্তার পাশ ধরে হেটে গেলে দূর দূরান্ত আকাশ দেখা যাবে। ঢাকায় মনে পড়ে সাগুফতা দিয়ে হেটে সামনে গেলে অনেক খানি আকাশ দেখা যেত। প্রতিবার দেখার সময় একটা আশ মিটিয়ে দেখে নেবার সাধ ছিল কারন আশংকা কদিন বাদেই হয়ত আকাশটাকে গিলে খাবে গা ঘেঁষে উঠে যাওয়া আবাসিক বিল্ডিং আর ফ্লাইওভারের পিলার। এখন আকাশ দেখি-দূরের শহর দেখি-তারো পিছে পাহাড়ের গায়ে লেগে থাকা মেঘ দেখি। দেখতে দেখতে পাখিরা উড়ে যায়-নটার সময় সন্ধ্যা নামে। একা রাস্তায় হেটে হেটে ফিরি। এই মনে হয় ছিনতাই হয়ে গেলাম নাকি এই বুঝি সামনে কেউ এসে ঠ্যাক দিল, ভাবতে ভাবতে দেখি পাশ দিয়ে নিশ্চিন্তে সাইকেল চালিয়ে গাছের সারি পেরিয়ে যাচ্ছে এক ভিনদেশি মেয়ে। বাতাস আছে, গাছপালা আছে, পাখির ডাক আছে, সারাজীবন পিসি তে গেম খেলার সময় দেখে আসা কোম্পানির লোগো সহ অফিস আছে, কিন্তু কী যেন নেই।

বুটিক শপের আশ পাশ দিয়ে ঘুরি, দেয়ালে আকা গ্রাফিটী দেখি, স্কোয়ামিশ মানুষের ইতিহাস ঘাটি গুগলে। সাদা,কালো, ধুসর বা এক রঙ্গা ফ্যাশনে থাকা মানুষগুলোর মধ্যে হুট হাট চোখে পড়ে দু একজন আল গোছে নকশী কাটা ব্যাগ ঝুলিয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে আনমনে। ঘুরতে এসে আইসক্রীম না খেলে কেমন হয়, ৭০ এর নামতা পড়ে খানিক হিসেব কষি-তারপর কি হবে এত ভেবে বলে চামচে কেটে নেই ব্ল্যাকফরেস্ট ব্লাস্ট এর স্কুপ। একই রকমই-৯০ দশকের বিদেশ দেখা আর ২১ এর গ্লোবাল যুগে এসে বিদেশের স্বাদ দেশের মতই লাগে। পাখি গুলো পায়ের উপর দিয়ে হেটে যায়-মানুষকে ভয় পাবার কোডটা ওদের জিনে এখনো লেখা হয়নি। চি চিই শব্দ করতে করতে থপ থপ করে হেটে বেড়ায় আশ পাশ দিয়ে-চুপ করে বেঞ্চের পাশে বসে শুনে নানান দেশের গল্প। বসে পড়ি প্রাইড ফ্ল্যাগ উড়তে থাকা একটা ইয়ট এর পিছে-এর মধ্যে লাইভ গান ভেসে আসে। স্কট জেকব নামের ইন্সটাগ্রাম গায়ক কালো টিশার্ট আর জিনসের শর্টস পরে স্যান্ডেল পায়ে গেয়ে যাচ্ছে অনলি নো ইউ লাভ হার হোয়েন ইউ লেট হার গো। 

নীল পানির মৃদু মন্দ স্রোত, বিকেলের পড়ে আসা রোদে ঢিলে সোয়েটার পরে সান কিসড ছবি, বাজারের পলিথিন ব্যাগে পেয়াজ, ব্যাগের ভেতরে পড়ে থাকা স্কেচবুক, গিটারের সামনে ১০ ডলারের সিডির বাক্স, দৌড়ে পার হয়ে যাওয়া রোলার স্কেট, বাচ্চাদের ছুটোছুটী-সবই  হোয়াইট নয়েজে মিলিয়ে যায়। যেন মুভির একটা সেটে বসে থাকা এক্সট্রা আমি-ছক বেধে হিসেব কষে চলছে সব পাশ দিয়ে। স্ক্রিপ্ট বেঁধে ডিরেকটর, সিনেমাটোগ্রাফার, আর্ট ডিরেকটর পরের শট টা বলে দিচ্ছেন। পারফেকশনের মধ্য দিয়ে কাঠের তক্তায় জুতার ক্যাচ ক্যাচ শব্দ তুলে রেলিং এ ঝুকে তাকাই নিচে। পানিতে রিফ্লেকশন বলে দেয় হাতে তাকিয়ে দেখ-ধোয়া ওঠা সর ভাসা দুধ চার কাপটা নেই।

শুক্রবার, ২০ আগস্ট, ২০২১

ঢাকা টু ভ্যানকুভার

পাগলামি জীবনের এক বাঁকে এসে মোড় ঘুরে পৌছলাম ভ্যানকুভার। এবারের টার্গেট আবার পড়াশুনা-বিসি আই টি তে থ্রিডি মডেলিং, আর্ট এবং এনিমেশনের ডিপ্লোমা প্রোগ্রামে দু বছরের কোর্স। নতুন শহর, নতুন জায়গা, নতুন দেশ-প্রতিদিন মনে হচ্ছে নিত্য নতুন জিনিসের সাথে পরিচয় হচ্ছে। চেনা কাজ গুলি নতুন করে শিখতে হচ্ছে-শিখতে হচ্ছে রাস্তা পার হবার মত দৈনন্দিন জিনিস ও।

চারপাশ খুব নির্জন, বেসমেন্টে বসে বাইরের গাড়ির আওয়াজ পাওয়া যায় শো শো। ভাগ্য ভাল আমার এক পরিচিত কাছের বন্ধু পেয়ে গেছি এই দূর দেশে। পাতাল থেকে বেরিয়ে আকাশের ট্রেনে চেপে চলে যাওয়া যায় ডাউনটাউন। চোখ ধাঁধান প্রাসাদ সমান বাড়িঘর, নীল আকাশ, গুটি গুটি পায়ে সিগনাল পেরুন ছোট্ট কুকুর, হাত ধরে হাটতে থাকা কপোত কপোতি, সবাই আছে নিজের মত। ইংরেজি দেশে এসে কানে ভেসে আসে সারা বিশ্বের আওয়াজ, শাঁই করে পাশ কেটে বেরিয়ে যায় একটা ল্যাম্বো, রোদের তাপটা খুব চোখে লাগে, ডাউন হিল হাটতে হাটতে ক্যামেরায় বন্দী করি আশ পাশ, ভীড়ের মাঝে খুজি একটা চায়ের আড্ডা, ভদ্রতার মুখোশ এটে নিস্পৃহ ভাবে হেটে চলছে সবাই-নিঃস্তব্ধতা ভেঙ্গে দেয় হোমলেস লোকটা চিৎকার, আকাশ বাতাস কাপিয়ে সে জানায় তার কাপড় সে ধুতে পারেনা এই দেশে-কেউ ফিরে তাকায় না। মাপ করেন বলে চলে আসার অভ্যাসটা বদলে অদৃশ্য হিসেবে ধরে নেওয়ার নতুন একটা অভ্যাস করে নিতে হবে।

দিনের আলো থাকে, কিন্তু রাত হয়ে যায়-আলো পড়তে পড়তে শহরটার মানুষ কমতে থাকে। দোকান পাট গুলির ভেতরে আলো আছে-কিন্তু মানুষ নেই। খাবার দোকান বন্ধ ন টায়-টেনে টুনে দশটা। তারপর নির্জন, শুনশান। মেট্রোটাউন স্টেশনে নেমে ক্রিস্টাল মল, তার ভেতর দিয়ে এক নগ্ন মারমেইড স্ট্যাচুর পাশ হেটে মোড়ে এসে ডানে ঘুরে যাও-মোবাইলে সিম নেই-গুগল ম্যাপের বদলে তাই মাইন্ড ম্যাপ ধরে দু দিন ফিরতে হয়। মিনিট বিশেক হেটে বাসায় ফেরার রাস্তা-একা একা কাজ করার অভ্যাস থাকলে খুব কাজের জায়গা। কেউ ডাকবে না, ফেরাবে না, সাধবে না কিছু। কানে হেডফোনে বাজুক বাংলা গান-প্রিয় আকাশী।

ব্লগর ব্লগর আজকে খুব একটা জমছে না-কিছু আকতে হবে।



বৃহস্পতিবার, ২২ জুলাই, ২০২১

রঙ চং

চোখের সামনে ঘটতে থাকা জীবন খুব সাধারন-সাদামাটা-সাধাসিধে-বড্ড চেনা। এক তালে চলছে ঘড়ির কাটার সাথে টিক টিক টিক টিক-এক সেকেন্ড এখানে এক সেকেন্ডেই শেষ হয়, ঘন্টা হয় ৬০ মিনিটে, ২৪ ঘন্টায় শেষ হয় এক দিন। কিন্তু ডিজিটাল ক্যামেরার চোখে? মানুষের চোখের ঐ চিরচেনা আই লেভেল আর ১৭ মিলি এর লেন্সে আটকে নেই-জুমে যাচ্ছে, উপরে যাচ্ছে, নিচে যাচ্ছে, চাই কী চলে যাচ্ছে পাখির চোখে। দিন চলে যাচ্ছে চোখের পলকে, বিটের তালে তালে, মাপা মাপা ট্রানজিশনে-আবার পলকের মাঝে হারিয়ে যাওয়া মুহুর্তকে টেনে হিচড়ে মিনিটে কাটাচ্ছি। বাস্তবের জীবনে ছন্দ পতন নেই-আবহ সংগীত নেই-নির্লিপ্ত ভাবে বাস ট্রাকের আওয়াজের মাঝেই হয়ত গান গেয়ে উঠে কেউ কেউ।

চোখের সামনে ঘটতে দেখা ভয়ানকতম, আশ্চর্যতম, নিকৃষ্টতম ঘটনাটাও স্বাভাবিক যেন। একটা গুলি চলতে সময় লাগে ১ সেকেন্ড, লাগতে মিলি সেকেন্ড, আর শেষ নিঃশ্বাস টা বেরিয়ে যেতে ২ সেকেন্ড। কিন্তু ক্যামেরায়? পর্দায়? মোবাইলের টাচ দেয়ালে? সেখানে সময় আটকে যাবে, সাউন্ড ইফেক্টে বুক টা কেপে উঠবে, নেপথ্যে ভাষ্যকার করে উঠবেন আর্তচিৎকার, পর্দায় আসবে আতংকের বানী-শেষে থাকতে পারে কল টু একশন। তবেই না বাস্তবের ভয়ংকর রূপটা মানুষের মনে ঢুকবে। গনপিটুনির ভিড়ভাট্টার একদম পিছে থাকা লোকটার থেকে সিসি ক্যামের সামনে বসে থাকা লোকটা পিটুনির ভয়াবহতাটা ভালভাবে দেখে।

এই কায়দাগুলি কাজে লাগিয়ে বাস্তবটাকে রঙ চড়িয়ে খুব সাদামাটা জিনিসও আজকাল দেখার মত। ফেসবুকে লোকজন খেতে যাচ্ছে, বাসে চড়ছে, কাজে যাচ্ছে, দৌড়াচ্ছে, খেতে কাজ করছে, মুলো শাক বাছছে, পেয়াজ ভাজছে, বোতল ভাংছে, গাড়ি চাপছে, পাহাড় বাইছে, চানাচুর খাচ্ছে, মাংস কাটছে, ছবি তুলছে, আলু বুনছে-সবাই দেখছে। দেখছে। চোখের সামনেও এসব ঘটছে-কিন্তু পর্দায় দেখছে। গিলটি প্লিজার-নির্দোষ আনন্দের উলটো। নিষ্ক্রিয় আনন্দ। সম্মোহনের আনন্দ। হোয়াইট নয়েজ। হোয়াইট নয়েজ। হোয়াইট নয়েজ। সবই কনটেন্ট, সবাই কনজিউমার। পাচ মিনিটের ক্রাফট, পাচ মিনিটের শব্দ আর আলোর মিক্সচার। টুক করে খেয়ে নিন-সহজ পাচ্য। পুষ্টীগুন? শিক্ষা? বিনোদন? কুশিক্ষা? কিছু পাবেন না-পাচ মিনিটের খোরাক-পাচ মিনিটেই গায়েব।

বুড়ো মানুষের ভবিষ্যত নিয়ে ভাবনা যুগে যুগে ছিল, আছে, থাকবে। এসবে পাত্তা দিবেন না।






রবিবার, ১১ জুলাই, ২০২১

আমার সিংগাড়া খেতে ভাল লাগে না

 ইদানিং সিংগাড়া খেতে আর ভাল লাগে না। আগে মনে আছে সিংগাড়া অনেক মজা করে খেতাম। ফকিরাপুলের কাছের অফিসের নিচের দোকানে খাওয়া সিংগাড়ার কথা অনেক মনে পড়ে। অফিস কাজের ফাকে ১১-১২ টার দিকে এনাম ভাইকে নিয়ে টুক করে বসের চোখ এড়িয়ে নিচে চলে যেতাম। অফিসপাড়ার গরম থাকত দোকানটায়-শেয়ার, লোন, টাকা, কড়ির আলোচনার মধ্যে সাদা প্লেটে বড় বড় কাটা পেয়াজ সহ চলে আসত সিংগাড়া।  ভেতরে বাদাম থাকত, নাকি থাকত না-আলুর সাথে কি মাখিয়ে যে সিংগাড়া গুলো তৈরী হত জানি না। ফু দিয়ে টকে ডুবিয়ে সেই সিংগাড়া খাওয়া হয়নি অনেক দিন। এখন খেতে গেলে এসিডিটি, গ্যাসট্রিক এসবের চিন্তা সেই স্বাদকে আটকে দিতে চায় মনে হয়। সিংগাড়া এখন খেতে গেলে খোলস টা মোটা মনে হয়-নিচের কোনার দিকের অংশ গুলো ভেঙ্গে রেখে দেই। কারন ওখানে খাবার মত কিছু নেই-শুধু পেয়াজ কাচা মরিচ আর টক দিয়ে একসময় ঐ মুড়োন খোলস গুলো ও খেয়ে ফেলতাম।

তবে এখন সমুচা ভাল লাগে। তিনকোনা পাতলা পরতের সমুচা-এর সাথে পেয়াজ চলেনা। তেতুলের টক হলেও সই, না হলেও ক্ষতি নেই। ভেতরে ক্যারামেলাইজড পেয়াজ, ঝালের বাড়াবাড়ি নেই, আলুর বাড়তি নেই। তিন কামড়ে একটা শেষ-ছোট ও হতে পারে, এক বারেই মুখে চলে যাচ্ছে। প্রথম কামড়ের পর টকে ডুবিয়ে অন্য রকম একটা দ্বিতীয় কামড়। স্কুলের কথা মনে পড়ে যায় সমুচায়-টিফিন টাইমে ফ্রেন্ডস কর্নার, ছুটির দিনে হার্ট ওয়ার্ল্ড-তেতুল বিচি ভাসা বাদামি রঙ এর টক-টিনের প্লেটে সমুচা। ২ টাকা পিস হয়ত।

এখন তাই সমুচা খাই। সিংগাড়ার স্বাদ নিতে ভুলে যাচ্ছি-সমুচার প্রেম আবার ফেরত আসছে। ৩০ এর দশক টাই নাকি এমন-স্কুল ফ্রেন্ডরা আবার অনেক আপন হয়ে যায়। নস্টালজিয়া ফেরত আসতে থাকে- স্মৃতির কুয়াশা ঘেরা অলি গলি হাতড়ে বেড়াতে মন চায়। অনেক অনেক দূরে চলে যাবার আগে মেমোরি গুলোকে আর একবার ঝালিয়ে নিয়ে সময়গুলো বয়ে যেতে দেখা।

বুধবার, ৭ জুলাই, ২০২১

আমাদের শেষ নিঃশ্বাস কবে ছিল?

 আমাদের শেষ নিঃশ্বাস কবে ছিল?

শেষ কবে প্রান খুলে শ্বাস নিয়েছি?

মহামারীর দিন গুলি কেটে যাচ্ছে একটার পর একটা, সিনেমায় মেশিন গান থেকে যেভাবে গুলির খোসা একটার পর একটা ছন্দে পড়তে থাকে সেভাবে। বৈচিত্র ছাড়া একটানা।

কিন্তু তার আরো অনেক অনেক আগেই, আমরা কি শেষ নিঃশ্বাস টা নেইনি?

দায়িত্ব, জীবন বাস্তবতা, সংসার, চাকরি- এসব কিছু কি আসলে মুখোশ? আমাদের ভেতর টা কী আরো আগেই মারা যায়নি?

কাজ কর্ম চাকরি বাসা বাড়ি-এসবের আড়ালে থেকে আমরা ভাবি জীবনটা কেটে গেল এই করতে করতে-কত কি না করতে পারতাম এসব না থাকলে। কিন্তু আমরা স্বীকার করিনা যে এগুলি না থাকলেও আসলে আমাদের কিছু করার নেই আসলে। আমরা রোমান্টিসাইজ করতে পারি যে অনেক কিছু করতে পারতাম হয়ত অবসর পেলে, কিন্তু অবসরে কিছু করার মন আমাদের আর হয়ত নেই।

নতুন গান শুনে এখন আর অবসর ক্যাটাতে পারি? একটা নতুন গান নিজের পুরনো ৯০, ২০০০ দশকের প্লে লিস্টে জায়গা করে নিতে পারে? কোন সিরিজে শুনা একটা গানের লিরিক লিখে ইন্টারনেটের তস্য গলি ঘুপচি ঘেটে ইন্ডি, পপ, রক গান বের করার ইচ্ছা টা তো মরে গেছে।

অবসর পেলে এখন আর ইচ্ছা করে না নতুন গেমটা খেলি। একটু অবসরে ঝির ঝিরে মনিটরে কনভার্টার কেবল লাগিয়ে গেম খেলার ইচ্ছে গুলো মরে গেছে-মৃত জম্বি লাশকে টেনে আনার মত গেম বানাবার চেয়ে এখনকার অবসর কাটানো মনকে আকর্ষন করা সহজ। তাই গেম গুলিও সেই আগের ট্রোপেই ঘুরপাক খায়-ঝা চকচকে গ্রাফিক্সে এখন খেলতে পারলেও জীবনের সেরা গেম বলে মনে হয় ১৪ ইঞ্চি সি আর টি মনিটরে স্কুল ফাকি দিয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খেলে শেষ করা এক অখ্যাত গেম।

এখন আর ভাবা যায়-অবসরে এক পাল ছেলে পেলে মিলে একই রকম ড্রেস পরে, ঝুম বৃষ্টী কাদায় কাক ভেজা হয়ে নিশ্চিন্তে হাটতে হাটতে বাড়ি ফেরা? মোবাইল ভেজার ভয় নেই, মানিব্যাগের কার্ড হারাবার ভয় নেই, জুতো কাদা মাটিতে নষ্ট হবার ভয় নেই, চুল ভিজে ঠাণ্ডা লাগার ভয় নেই, ছাতা রেইনকোটের বালাই নেই-এখন আর ভাবা যায়? সব দায়িত্বের মুখোশ টেনে ফেললেও তো ইচ্ছে গুলো জাগে না আর।

তাই আমরা ডুব দেই কাজের আড়ালে। ব্যাস্ততা, ম্যাচিউরিটি, কাজ, গাম্ভীর্য এর আড়ালে লুকোই। নিজেকেও হয়ত বোঝাই সময় নেই বলে হচ্ছে না কিছু। কিন্তু আয়নার সামনে দাড়ালে বুঝেই যাই, ঐ পুরনো ছেলেটা মরে গেছে।